
এম মনির চৌধুরী রানা
বাস মালিক সমিতি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে বিভিন্ন শ্রেণীর বাস-মিনিবাসে ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলছে। গত কয়েকদিন ধরে রাজধানীসহ সারাদেশে বিভিন্ন নগরীর সিটি সার্ভিস ও দুরপাল্লার বাসে এমন চিত্র দেখা যাচ্ছে। নৌ-পথের বেশিরভাগ রুটে এমন নৈরাজ্যের চিত্র দেখা গেলেও সরকার ও বাস মালিক সমিতি বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করছে। এতে করে একদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বৃষ্টি-বাদল, কালবৈশাখী অন্যদিকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য স্বস্তিদায়ক ঈদযাত্রায় মানুষের যাতায়াতের দুর্ভোগ অসহনীয় করে তুলেছে বলে দাবী করেছে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি।
ঈদযাত্রায় ভাড়া নৈরাজ্য ও মানুষের যাতায়াত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের এক সংক্ষিপ্ত সমীক্ষা তুলে ধরে আজ ২৭ মে ২০২৬ বুধবার দেশের গণমাধ্যমে পাঠানো এক বার্তায় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোঃ মোজাম্মেল হক চৌধুরী এমন চিত্র তুলে ধরেন।
সংগঠনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এবারের ঈদযাত্রায় যাতায়াতকারী যাত্রী সাধারণের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া না করার ঘোষণা দিয়েছিলেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি। এই ঘোষণা বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে ঢাকাসহ সারাদেশের সিটিসার্ভিস ও দুরপাল্লার বাসে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য চলতে দেখা যাচ্ছে। মূলত পরিবহন শ্রমিকদের বেতন ও ঈদ বোনাস কার্যকর না থাকায় এমন নৈরাজ্যে বাধ্য হচ্ছেন বলে যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষকদের কাছে বিভিন্ন বাসের চালক-হেলপারেরা অভিযোগ করেছেন।
এবারের ঈদে সারাদেশে দুরপাল্লায় প্রায় সাড়ে আটশ রুটের মধ্যে মাত্র ২৭ টি রুট পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে ২৬ টি রুটে ২৩৪০০০ যাত্রীর কাছ থেকে ৫ কোটি ৬১ লাখ ৯৩ হাজার টাকা বাড়তি ভাড়া আদায় করা হয়েছে। এবারের ঈদযাত্রায় ঢাকা থেকে প্রায় ৯৫ লাখ যাত্রী সারাদেশে যাতায়াত করছে। এছাড়াও সারাদেশের আন্তঃজেলায় আরো কমবেশি ৩ কোটি ট্রিপ যাত্রী যাতায়াত হতে পারে। দীর্ঘদিন যাবৎ পরিবহন সেক্টর সংস্কার না হওয়ায়, চালকদের বেতন ও কর্মঘন্টা কার্যকর না থাকায়, ভাড়া আদায়ের পদ্ধতি ও পরিবহন পরিচালনার পদ্ধতির পদে পদে গলদ থাকায় প্রতিবছর ঈদে দেশের যাত্রীসাধারণ এমন নৈরাজ্যের শিকার হলেও ঈদযাত্রায় সার্বিক মনিটরিং কার্যক্রমের জন্য গঠিত কমিটিও বাস মালিক সমিতি ও সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নিয়ন্ত্রণে থাকায় সরকার নানাভাবে চেষ্টা করে ও যাত্রীসাধারণকে স্বস্তি দিতে বার বার ব্যর্থ হচ্ছে ।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঢাকা-খুলনা রুটে ৫১ আসনের বাসে ৫৪১ টাকার ভাড়া ১০০০ টাকা, ঢাকা-বরিশাল রুটে ৫৯২ টাকার ভাড়া ৮৫০ টাকা একই রুটে বিআরটিসি দোতলা বাসে ৭০০ টাকা, ঢাকা-পটুয়াখালী রুটে ৫৭০ টাকার ভাড়া ১০০০ টাকা, ঢাকা-শরিয়তপুর রুটে ২৩৩ টাকার ভাড়া ৫০০ টাকা, চট্টগ্রাম-বরগুনা রুটে ১১৯৭ টাকার ভাড়া ১৮০০ টাকা, ঢাকা-মাদারীপুর রুটে ২৫০ টাকার ভাড়া ৫০০ টাকা, ঢাকা-গোপালগঞ্জ রুটে ৫২০ টাকার ভাড়া ৭০০ টাকা, ঢাকা-ফরিদপুর রুটে ৩০০ টাকার ভাড়া ৫০০ টাকা, ঢাকা-যশোর রুটে ৫০০ টাকার ৬০০ টাকা, ঢাকা-শিবচর রুটে ২০০ টাকার ভাড়া ৩৫০ টাকা, ঢাকা-ঝালকাঠি রুটে ৬০০ টাকার ভাড়া ৭০০ টাকা, ঢাকা-ঝিনাইদহ রুটে ৫০১ টাকার ভাড়া ৮৩০ টাকা, ঢাকা-মাগুরা রুটে ৬৫০ টাকার ভাড়া ৮০০ টাকা, ঢাকা-কুষ্টিয়া রুটে ৭৫০ টাকার ভাড়া ৮০০ টাকা, ঢাকা-দিনাজপুর রুটে ৬০০ টাকার ভাড়া ৯০০ টাকা, চট্টগ্রাম-বগুড়া রুটে ১০০০ টাকার ভাড়া ১৮০০ টাকা, চট্টগ্রাম-গাইবান্ধা রুটে ১১০০ টাকার ভাড়া ২২০০ টাকা, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ৫৫২ টাকার ভাড়া ৮০০ টাকা, ঢাকা-চুয়াডাঙ্গা রুটে ৭০০ টাকার ৮৫০ টাকা, ঢাকা-ভাঙ্গা রুটে ২০০ টাকার ভাড়া ৪০০ টাকা, ঢাকা-নড়াইল ৩৮৬ টাকার ভাড়া ৫০০ টাকা, ঢাকা-ফেনী রুটে ৪৪০ টাকার ভাড়া ৬০০ টাকা, ঢাকা-কুমিল্লা রুটে ৩০০ টাকার ভাড়া ৪০০ টাকা, ঢাকা-টেকেরহাট রুটে ৩০০ টাকার ভাড়া ৪০০ টাকা, ঢাকা-পিরোজপুর রুটে ৫৯০ টাকার ভাড়া ৭০০ টাকা আদায় করতে দেখা গেছে। পর্যবেক্ষণকালে দেখা গেছে ৫২ আসন বিশিষ্ট বাসে ভাড়ার তালিকা জালিয়াতি করে ৪০ আসনের ভাড়ার তালিকা লাগানো হয়েছে। এছাড়াও স্বল্প দুরুত্বের যাত্রীদের সর্বশেষ গন্তব্যের ভাড়া আদায় করতে দেখা গেছে। তবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে সরকারের কঠোর অবস্থান ও বাস মালিক সমিতির নানামুখী তৎপরতা কারণে বিগত ঈদুল ফিতরের থেকে কিছুটা সীমিত রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণকালে দেখা গেছে।
এহেন অতিরিক্ত ভাড়া নৈরাজ্যর কারণে দ্রব্যমুল্য বাড়ছে, পরিবহনে চাঁদাবাজি বাড়ছে, সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, অনিয়ম-দুর্নীতি, পরিবহনে বিশৃঙ্খলা ও সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। নিম্ম আয়ের লোকজন বাসের ছাদে, ট্রেনের ছাদে, পণ্য বোঝাই ট্রাকে, খোলা ট্রাকে স্বল্প ভাড়ার যাতায়াতে বাধ্য হচ্ছে। এখান থেকে উত্তরণে জন্য গণপরিবহনে ডিজিটাল লেনদেনে ভাড়া আদায় চালু করা, নগদ টাকার লেনদেন বন্ধ করা, চালকদের বেতন ঈদ বোনাস কার্যকর করা, সড়ক-মহাসড়কে সিসি ক্যামরা পদ্ধতিতে ই-প্রসিকিউশন চালু করা, আইনের সুশাসন নিশ্চিত করা, ঈদযাত্রা মনিটরিং কমিটি থেকে বাস মালিক সমিতি ও শ্রমিক ফেডারেশনকে বাদ দিয়ে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা শুধুমাত্র সরকারের নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরী বলে মনে করেন যাত্রী কল্যাণ সমিতি।